রেস্তোরাঁ থেকে নেভাল এলাকায় কিভাবে গেল তাসফিয়া, তাহলে কি পরিকল্পিতভাবে খুন?













কক্সবাজারের টেকনাফে তাসফিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফ ডিগ্রী কলেজ মাঠে নামাজে জানাযার পর কলেজ সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাযায় আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ছাড়াও শোকাহত শত শত মানুষ অংশ নেন। এর আগে, বিকালের দিকে চট্রগ্রাম মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তাসফিয়ার লাশ পৈত্রিক নিবাস টেকনাফ পৌরসভার ডেইল পাড়া এলাকায় পৌঁছলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

এসময় আত্মীয় স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারীতে বাতাস ভারী হয়ে উঠে। এসময় আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও শত শত জনতা বাড়িটিতে ভিড় জমান। নির্মম হত্যার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবি জানিয়েছেন উপস্থিত সবাই। তাসফিয়া আমিনের মৃত্যুর রহস্য এখনো জানাতে পারেনি পুলিশ। রহস্য উদ্ঘাটনে দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

রেস্তোরাঁ থেকে নেভাল এলাকায় কিভাবে গেল তাসফিয়া? বাসা থেকে বের হয়ে বন্ধুর সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় যায় দু’জন। সেখান থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও গিয়েছিল কি-না এবং তাসফিয়ার হাতে টাকা ছিল না, তাহলে কীভাবে নেভাল এলাকায় গেল সে- এ দুটি প্রশ্নের উত্তর মিললে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন হবে বলে মনে করছে পুলিশ। তাসফিয়াকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে বলে দাবি করে হত্যা মামলা করেছেন তার বাবা মো. আমিন।

বৃহস্পতিবার পতেঙ্গা থানায় এ মামলা করা হয়। মামলায় তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। বাকিরা হলো- মো. সোহাইল, শওকত মিরাজ, আসিফ মিজান, ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম ও মো. ফিরোজ। আদনান মির্জাসহ অন্য আসামিরা সবাই যুবলীগ নেতা ফিরোজের অনুসারী বলে জানা গেছে। ফিরোজ দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সারোয়ার-ম্যাপনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। বর্তমানে নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কর্ণফুলী অঞ্চল) জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে তাসফিয়াকে নেভাল এলাকায় যারা দেখেছিল, তারা ও বন্ধু আদনান মির্জার কথার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। দুপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে তাসফিয়া কীভাবে নেভাল এলাকায় গেল, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত করে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, বাসা থেকে বের হওয়ার পর দু’জনই সিআরবি এলাকায় গিয়েছিল। এরপর গোল পাহাড় চায়না গ্রিলে কিছুক্ষণ সময় কাটায় দু’জন। সেখান থেকে একসঙ্গে বের হয়। তবে সে আর বাড়ি ফেরেনি।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বন্ধু কর্ণফুলীর তীরে দেয়ালের ওপর এক কিশোরীকে বসে থাকতে দেখে। এক পর্যায়ে সেখানে তাকে আর দেখেনি তারা। কিছুক্ষণ পর কর্ণফুলীর তীরে পাথরের ওপর ওই কিশোরীকে বসে থাকতে দেখে। এক পর্যায়ে একটি চিৎকার শোনে। কিছুক্ষণ পর সেখানে স্থানীয় লোকজন ও তিন বন্ধু গিয়ে কাউকে দেখতে পায়নি আর। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে কর্ণফুলীর তীরে পাথরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকায় অবস্থায় ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ সূত্র জানায়, আদনান তাসফিয়াকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দেওয়ার পর বাসায় না গিয়ে অন্য কোথাও গিয়েছিল কি-না কিংবা বাসায় গিয়ে আবার বের হয়েছিল কি-না তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তাসফিয়ার হাতে কোনো টাকা ছিল না, তাহলে কীভাবে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পতেঙ্গা নেভাল এলাকায় গেল তাও জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে বুধবার রাতে আটক তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান পতেঙ্গা থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, ‘তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। আগামী রোববার শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।’ তাসফিয়ার হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে নাসিরাবাদ সানশাইন গ্রামার স্কুলের সামনে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষক ও তার সহপাঠীরা।

তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার ওপর চালানো ভয়াবহ চিত্র। নিহত তাসফিয়ার পিঠজুড়ে পাওয়া গেছে নির্যাতনের ছাপ। কিশোরীটির পিঠ, বুক ও স্পর্শকাতর অঙ্গসহ সব স্থানেই দেখা গেছে ভয়াবহ নির্যাতনের ছাপ।

গোলাকার মুখমণ্ডল থেঁতলানো। চোখ দুটোও যেন নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আর বুকের ওপর একাধিক আঁচড়ের দাগও দেখা গেছে। নিহতের হাতের নখগুলো ছিল নীলবর্ণ। লাশটি পাওয়ার পর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন সিএমপি পতেঙ্গা থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার।

এ অবস্থায় তাসফিয়াকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করছে তাসফিয়ার বাবা। শেষে হত্যা করে লাশটি ফেলে দেয়া হয় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উপকূলে। এমনটাই দাবি করেছেন তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এসময় তিনি আদনান ও তার সহযোগীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন।

এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাসপিয়ার ময়নাতদন্ত হয়। এই ময়নাতদন্তে অংশ নেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুমন মুর্শিদীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টিম। এই টিমের অপর সদস্যরা হলেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুজন, ডা. জাহানআরা রোজি ও ডা. স্মৃতি।

দীর্ঘ এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ময়নাতদন্ত শেষে দুপুর দেড়টায় তারা লাশকাটা ঘর থেকে বের হন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সুমন মুর্শিদী বলেন, ভিসেরা ও সিআইডি রিপোর্ট পাওয়ার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই দুই রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিস্তারিত জানানো যাবে।

এদিকে মরদেহ উদ্ধারের পর ৩৬ ঘণ্টা পার হলেও সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া আমিনের মৃত্যুর কারণ জানতে পারেনি পুলিশ। মঙ্গলবার (০১ মে) বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর বুধবার (০২ মে) সকালে নগরীর পতেঙ্গা এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় তার মৃতদেহ। আত্মহত্যা নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে? এই দুয়ের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে পুলিশের তদন্ত।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময়ে সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাওয়া পোশাকের সঙ্গে মরদেহের পোশাকের মিল না পাওয়া, পতেঙ্গা পর্যন্ত পৌঁছানো নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে ফিরছে পুলিশ। নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (বন্দর জোন) আরেফিন জুয়েল বলেন, ‘তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা ইতোমধ্যে তার ছেলে বন্ধুকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সে আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে আমরা তা খতিয়ে দেখছি। সম্ভাব্য সব বিষয়কে মাথায় রেখে তদন্ত কাজ চলছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে আমরা তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পারবো।’

মঙ্গলবার বিকালে বাসা থেকে বেরিয়ে গোলপাহাড় এলাকায় চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে যায় তাসফিয়া। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেখান থেকে তাকে বের হতে দেখা গেছে রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তার বন্ধু আদনান জানিয়েছে, তাসফিয়া তার কাছ থেকে ১০০ টাকা সিএনজি ভাড়া নিয়েছিল। তবে গোলপাহাড় থেকে পতেঙ্গার সিএনজি ভাড়া কমপক্ষে আড়াইশ টাকা।

রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাসফিয়ার পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ। আর মরদেহ উদ্ধারের সময় পরনে ছিল স্কার্ট। এই পোশাক পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মরদেহের মুখে ফেনা পাওয়া যায়। এ ধরণের ফেনা বিষপানের ক্ষেত্রে দেখা যায়। প্রশ্ন উঠেছে, তাসফিয়া কি বিষপান করেছে? নাকি অন্য কোন ওষুধ খাইয়ে তাকে মারা হয়েছে?

যদি বিষপান করে তবে সে বিষ কেনার টাকা পেল কোথায়? সিএনজির ভাড়া দেওয়ার পর আর কোন টাকা থাকার কথা না। যদি তাসফিয়া বিষপান করে তবে বিষপান করার পর সড়ক থেকে ২০/২৫ ফিট দূরে কীভাবে গেল? লাশটা উপুড় হয়ে থাকবে কেন? যদি সে আত্মহত্যা করে তবে তার হাতে থাকা সোনার আংটি গেল কোথায়? নিজের ব্যবহারের মোবাইল ফোনটি কোথায়?

পুলিশ আরও খতিয়ে দেখছে, যদি তাসফিয়া আত্মহত্যা না করে থাকে তবে তাকে কে হত্যা করেছে? কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে? তার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কি আদনান জড়িত? যদি আদনান তার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে রাতে যখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আদনান তাসফিয়ার বাবার সঙ্গে কীভাবে ছিল? যদি আদনান হত্যাকাণ্ড না ঘটিয়ে থাকে তবে কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে? কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে?

এ সর্ম্পকে জানতে চাইলে পতেঙ্গা থানার ওসি আবুল কাশেম ভূইয়া বলেন, ‘তাসফিয়ার মৃত্যু অনেক রহস্যে ঘেরা। তার মৃত্যুকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আমরা সব বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পরনের কাপড় চেঞ্জ করেছেন কিনা, করলে কোথায়, কখন, কীভাবে চেঞ্জ করলেন, আমরা তদন্ত করে দেখছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত রিপোর্টসহ পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয়ে ওপরও নির্ভর করছে। তার ময়নাতদন্ত হয়েছে। এখন কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস হবে, তার ভিসেরা ফ্রিজার্ভ করা আছে।’ একই ধরনের মন্তব্য করেছেন অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার আরেফিন জুয়েল।

তিনি বলেন, ‘আমরাও এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি। তাকে বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজি ভাড়া ১০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। সে ওই টাকা দিয়ে পতেঙ্গা কীভাবে গেল?’ মৃতদেহ পড়ে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাসফিয়ার মৃতদেহ নদীর পাড়ের রিটেইনিং ওয়াল থেকে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ ফিট দূরে ছিল। লাফ দিয়ে এতদূর যাওয়া সম্ভব না। কেউ ধাক্কা দিলেও এত দূরে যাওয়ার কথা না। নদীতে আসা জোয়ার তার মরদেহ ওখানে নিয়ে যেতে পারে।’

তাহলে কি তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আরেফিন জুয়েল বলেন, ‘সে নিজেও নদীতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে। আবার কেউ তাকে নদীতে ফেলে দিতে পারে। আমরা এসব বিষয় তদন্ত করে দেখছি।’